প্যারিস চুক্তির সব ধারা বাস্তবায়নের আহ্বান শেখ হাসিনার

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবেশের আরও অবনতি রোধকল্পে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্যারিস চুক্তির সব ধারাসহ প্রাসঙ্গিক বৈশ্বিক চুক্তি ও প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন।

সোমবার (২ ডিসেম্বর) জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (কপ২৫)-এর সাধারণ গোলটেবিল আলোচনায় বলেন, জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ব্যর্থতার ফলাফল সকল দেশের ওপর সমানভাগে, বিশেষ করে যেসব দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বেশি দায়ী তাদের ওপর বর্তাবে এবং আমাদের নিষ্ক্রিয়তা প্রত্যেক জীবিত মানুষের জন্য হবে মারাত্মক।

তিনি আরও বলেন, পরিবেশের আরো অবনতি রোধকল্পে আমাদের প্যারিস চুক্তির সকল ধারাসহ প্রাসঙ্গিক সকল বৈশ্বিক চুক্তি ও প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে হবে।

মারাত্মক পরিস্থিতি এবং মারাত্মক পরিস্থিতে রূপ নেয়া ঠেকাতে এই জন্য পদক্ষেপ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তোলা নেতৃবৃন্দ এবং রাজনৈতিকদের দায়িত্ব উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা সিদ্ধান্তহীনতার কারণে সিদ্ধান্ত নিতে পারি না।

জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতিসংঘ ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের কপ২৫ স্পেনের বৃহত্তম এক্সিভিশন কমপ্লেক্স ও ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যু ফেরিয়া ডি মাদ্রিদে সোমবার সকালে শুরু হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন থেকে সকল আলোচনায় ‘লস অ্যান্ড ডেমেজ’ নীতিকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং পর্যালোচনার মাধ্যমে লস অ্যান্ড ডেমেজ অর্থায়ন বিবেচনায় ‘ওয়ারস’ ইন্টারন্যাশনাল মেকানিজম’কে আরো জোরালো সমর্থন দিতে হবে।

তিনি বলেন, জলবায়ু অর্থায়নের বৈশ্বিক চিত্রপট খুবই সমন্বয়হীন, জটিলতাপূর্ণ ও অত্যন্ত অপ্রতুল।

শেখ হাসিনা বলেন, প্যারিস চুক্তিতে ‘অভিন্ন কিন্তু পৃথকীকৃত দায়িত্ব’-এর নীতির ভিত্তিতে বিশেষ পরিস্থিতি এবং স্বল্পোন্নত দেশসমূহ ও ‘বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশসমূহ’-এর প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। জলবায়ু অর্থায়নের প্রত্যেক সরবরাহ প্রক্রিয়ায় এই স্বীকৃতি মেনে চলতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্যারিস চুক্তির কাঠামো ও বাস্তবায়নের আলোকে সমতা অথবা স্বচ্ছতার ধারণা একটি মৌলিক ইস্যু, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সহযোগিতায় এই চুক্তির সুফল অর্জিত হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদনের উল্লেখ করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠির এক-তৃতীয়াংশ ঝুঁকিতে রয়েছে।

তিনি বলেন, সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে ২০৮০ সাল নাগাদ প্রায় চার কোটি লোক গৃহহীন হবে এবং গত এপ্রিলে ইউনিসেফ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থিতিস্থাপকতা ও অভিযোজন বিষয়ে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জিত হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ৬০ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে স্থানচ্যুত হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে এবং বাংলাদেশে এক কোটি ৯০ লাখ শিশু ইতোমধ্যে ঝুঁকিতে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের বৈরী প্রভাব বন্ধ করা না গেলে আমরা কখনোই এসডিজি অর্জন এবং দারিদ্র্য নির্মূল করতে পারবো না।

বদ্বীপ অঞ্চলে চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ-সুবিধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ নেদারল্যান্ডের সহায়তায় ডেল্টা প্লান ২১০০ প্রস্তুত করেছে। তিনি বলেন, দেশীভাবে আমরাই প্রথম এলডিসি দেশ যে ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেছে। আমরা এ পর্যন্ত আমাদের নিজস্ব উৎস থেকে প্রশমন ও অভিযোজন ক্ষেত্রে ৪১ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয় করেছি।

শেখ হাসিনা বলেন, সরকার প্যারিস চুক্তি মোতাবেক আমাদের দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার ঘোষণা করেছে এবং আশা করছে অন্যরাও তাদের নিজস্ব অঙ্গীকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ তার উদ্ভাবনী অভিযোজন ও প্রশমন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জলবায়ু স্থিতিশীল দেশে পরিণত হয়েছে এবং সফলভাবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি কমাতে সক্ষম হয়েছে। অন্যান্য দেশের জন্য যা অনুসরণযোগ্য হতে পারে।
তিনি বলেন, আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি ও অনুশীলন ব্যাপকভাবে প্রশংসিত ও অনুসরণযোগ্য হচ্ছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের সংসদে সম্প্রতি বৈশ্বিক উষ্ণতা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অন্যান্য পার্লামেন্টে উদ্যোগ গ্রহণের বৈশ্বিক জরুরি আহ্বান জানিয়ে জলবায়ু ঝুঁকির বর্তমান অবস্থা ঘোষণার একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতির তুলনায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ২০১৬ সাল ছিল তিনগুণ এ কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতির ঘটনা বাংলাদেশে অনুরূপ পরিস্তিতি সৃষ্টি করেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ১১ লাখ রোহিঙ্গার উপস্থিতি পরিবেশগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা কক্সবাজারে একটি পরিবেশগত ও সামাজিক ক্ষতির অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বন, পাহাড়, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জীবন-জীবিকার ক্ষতি করেছে।

তিনি বলেন, যেহেতু আমাদের কোন ভুল না থাকা সত্ত্বেও আমাদের লোকজন বাস্তুচ্যুত হবে, তাই আমরা আশা করি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের আবাসনের দায়িত্ব নিবে এবং তাদের জীবিকার সুযোগ দিবে। তিনি বলেন, অনেকের মধ্যে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ গ্রহণের আগ্রহের অভাব সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাংলাদেশ সম্মিলিত প্রয়াসের ব্যাপারে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী এবং জাতিসংঘ হচ্ছে সবচেয়ে উপযুক্ত প্লাটফরম।

তিনি বলেন, ১০০ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক অবদানসহ আমাদের অঙ্গীকার অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার সকল ‘তহবিল’ নিয়োজিত করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

রোহিঙ্গাদের ফেরাতে মিয়ানমারকে চাপ প্রয়োগে নেদারল্যান্ডসের প্রতি আহ্বান

বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে নেদারল্যান্ডস সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ...